NewsDesk
রফিক উজ্জামান:
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা, ১ নম্বর সেক্টর ও পরে জেড ফোর্সের কমাণ্ডার হিসেবে সরাসরি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব এবং যুদ্ধপরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা জাতিকে স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা দিয়ে এক ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলো জাতির চিরন্তন প্রেরণা হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল দিনগুলো ছিল তেমনই এক ঐতিহাসিক সময়, যখন বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই সংকটময় মুহূর্তে দৃঢ় নেতৃত্ব ও সাহসিকতার মাধ্যমে জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার স্বাধীনতার ঘোষণা, বিদ্রোহ এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে ঐতিহাসিক পরিস্থিতি :
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করে রাখে। ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে বাঙালিদের প্রতি অবহেলা ও দমন-পীড়ন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালির রাজনৈতিক বিজয়—এসব ঘটনাই স্বাধীনতার আন্দোলনকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করায়। কিন্তু নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পরও বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর টালবাহানা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পুরো দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয় এবং বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে ওঠে। ২৫ মার্চের গণহত্যা ও প্রতিরোধের সূচনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নৃশংস সামরিক অভিযান চালায়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর শুরু হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, পুলিশ লাইনস এবং জনবহুল এলাকাগুলোতে চলে ভয়াবহ গণহত্যা। এই নির্মম ঘটনার পরই বাঙালির সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
জিয়ার বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা :
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই চট্টগ্রামে কর্মরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত প্রায় ২টা ১৫ মিনিটে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং তার অধীনস্থ বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করেন। চট্টগ্রামের বন্দরনগরীতে অবস্থানরত বাঙালি সেনাদের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি দীপ্ত কণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। এই ঘোষণা সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে জনগণের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ সাহস ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পায় এবং বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব ও সাহসিকতা :
শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি; তিনি মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে একজন সাহসী ও দক্ষ সামরিক নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সম্মুখসমরে নেতৃত্ব দেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিভিন্ন সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধ পরিচালনায় কৌশলগত দক্ষতার পরিচয় দেন। তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে এবং ধীরে ধীরে বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে।
জাতির অনুপ্রেরণার প্রতীক :
মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়ার ভূমিকা শুধু সামরিক নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তার ঘোষণা এবং সাহসিকতা বাঙালি জাতিকে মনোবল ও আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগে প্রস্তুত হওয়ার যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন, তার এক বড় উৎস ছিল সেই ঘোষণা এবং বিদ্রোহ। এই কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তার নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
বিজয়ের পথে অবদান :
১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য বীর শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়। এই বিজয়ের পেছনে অনেক বীরের অবদান রয়েছে, যাদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অন্যতম। তার সাহসী সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত প্রতিরোধে রূপ দিতে সহায়তা করেছিল।
ইতিহাসে স্থায়ী স্মৃতি :
আজ স্বাধীনতার বহু বছর পরও ২৬ মার্চের সেই ঐতিহাসিক রাত বাঙালি জাতির স্মৃতিতে অমলিন। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু একটি বার্তা ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করার আহ্বান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই সাহসী পদক্ষেপ জাতির সংগ্রামের এক গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তার নেতৃত্ব, সাহস এবং আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার মূল্য উপলব্ধি করতে অনুপ্রাণিত করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই জিয়ার বিদ্রোহ, ঘোষণা এবং যুদ্ধকালীন অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে—একটি জাতির মুক্তির সংগ্রামের অমর প্রতীক হিসেবে।